
হায়দার আলী চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
সমাজের সব মানুষ সমান সুযোগ-সুবিধা নিয়ে জন্মায় না। কেউ জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জীবন শুরু করেন, কেউ দুর্ঘটনায় হারান চলার শক্তি, আবার কেউ জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হয়ে পড়েন অসহায়। তাদের কাছে সরকারি সহায়তা শুধু একটি ভাতা বা একটি পরিচয়পত্র নয়—এটি নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস, নিজের অস্তিত্বের স্বীকৃতি এবং সমাজের মূলধারায় ফিরে আসার একটি আশার আলো।
সেই আশার আলোকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রতিদিন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে ভিড় করেন শত শত সেবাপ্রার্থী। কেউ হুইলচেয়ারে, কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে, কেউবা পরিবারের সদস্যের কাঁধে ভর করে আসেন। তাদের প্রত্যেকের চোখে থাকে একটি প্রশ্ন—‘আজ কি আমার কাজটি হবে?’
অফিসে আসা এসব মানুষকে সরকারি নিয়ম মেনে যথাযথ সেবা দিতে ব্যস্ত সময় পার করেন নুরুল ইসলাম। প্রতিবন্ধী নিবন্ধন, স্মার্ট প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র, প্রতিবন্ধী ভাতার আবেদন, বিভিন্ন সরকারি সহায়তা এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন নানা কার্যক্রমে তিনি ও তার কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সেবাপ্রার্থীদের সহযোগিতা করে থাকেন।
প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য একটি পরিচয়পত্র হয়তো অনেকের কাছে একটি সাধারণ কাগজ। কিন্তু একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কাছে সেটি হতে পারে চিকিৎসা, শিক্ষা, ভাতা কিংবা অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার প্রথম ধাপ। আর সেই কারণেই প্রতিটি আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
কার্যালয়ে আসা অনেক সেবাপ্রার্থী জানান, সরকারি অফিসে এসে ভালো ব্যবহার পাওয়া তাদের কাছে অনেক বড় প্রাপ্তি। কেউ কাগজপত্র বুঝতে পারেন না, কেউ অনলাইন আবেদন করতে জানেন না। এসব ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের সহযোগিতা তাদের ভোগান্তি কমিয়ে দেয়।
একজন বয়স্ক সেবাপ্রার্থী বলেন, “আমরা অনেক সময় নিয়মকানুন বুঝি না। অফিসে এসে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দিলে কাজ করা অনেক সহজ হয়ে যায়।”
আরেকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্বজন বলেন, “আমার সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন অফিসে যেতে হয়। এখানে এসে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা পেয়েছি। এতে আমাদের সময় ও কষ্ট দুটোই কমেছে।”
সমাজসেবা কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম বলেন, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সমাজের বোঝা নন। তাদেরও সমান অধিকার রয়েছে। সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে যায়, সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। নিয়ম মেনেই দ্রুত ও হয়রানিমুক্ত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি।”
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মূল লক্ষ্যই হলো পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এনে তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে উপজেলা পর্যায়ে সমাজসেবা কার্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বয়স্ক, বিধবা, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সরকারি সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সেবার প্রকৃত সাফল্য তখনই আসে, যখন একজন সাধারণ মানুষ সম্মান ও আন্তরিকতার সঙ্গে তার প্রাপ্য সেবা পান। তাই সেবার মান আরও উন্নত করা, হয়রানিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে সরকারি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকুক—এমন প্রত্যাশাই সবার।
প্রতিবন্ধী মানুষের একটি হাসি, একজন অসহায় মানুষের মুখে স্বস্তির ছাপ কিংবা একটি পরিবারের নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস—এসবই সমাজসেবার প্রকৃত সার্থকতা। আর সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই শিবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে।